কোভিড সংকটের ফ্রন্টলাইন : শ্মশান ও গোরস্থানের কর্মীবৃন্দ

সরকারি মতে, ভারতে প্রতিদিন কোভিডে আক্রান্ত ৪০০০ এর-ও বেশি মানুষের মৃত্যু হচ্ছে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিষেবার অভাবে। যাঁরা এই মৃতদের ধার্মিক ও সামাজিক রীতি অনুসারে শেষকৃত্যের দায়িত্বে আছেন, তাঁদের উপযুক্ত ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষামূলক উপকরণ বা PPE পরার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। PPE এর মধ্যে দস্তানা, ফেস-শিল্ড, চক্ষু রক্ষার জন্য গগলস, মেডিক্যাল মুখোশ ও আঁটোসাঁটো জুতো থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। মৃতদেহ বহন করার মাধ্যমে কোভিড সংক্রমণের সম্ভাবনা কলেরার মতো রোগের তুলনায় কম। কিন্তু মৃতদেহের শারীরিক তরল বা নিঃসরণের সংস্পর্শে এলে, কোভিড সংক্রমণ হতে পারে। কোভিডে মৃতদের ফুসফুস ও অন্যান্য অঙ্গে জীবিত ও সংক্রমণকারী ভাইরাস থাকতে পারে। মৃত্যু সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে, শ্মশান ও গোরস্থানের কর্মীরা দিনরাত এক করে কাজ করে চলেছেন। অধিকাংশ সময়েই তাঁদের কাছে কোভিড ভ্যাকসিন, কোভিড সংক্রমণ পরীক্ষা, উপযুক্ত PPE, আর্থিক সহায়তা, পর্যাপ্ত খাদ্য ও মানসিক স্বাস্থ্য পরিষেবার সুবিধা থাকে না। এই ফ্রন্টলাইন কর্মীদের অনেকেই ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক ও নিপীড়িত সম্প্রদায়ের সদস্য, যাঁরা আজও প্রাতিষ্ঠানিক জাতভেদের শিকার। আজ এই স্বাস্থ্য সংকটের সময় আমাদের উচিত এই মানুষগুলির ফ্রন্টলাইনে কাজের স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাঁদের অবস্থার উন্নতিতে প্রচেষ্ট হওয়া।

অনাক্রম্যতা কী?

অনাক্রম্যতা বলতে কোনও রোগ বা সংক্রমণজনিত জীব থেকে আমরা যে সুরক্ষা পাই তা বোঝায় । এই সুরক্ষা আমাদের নিজেদের শরীরের কোষ ও অণুগুলিই  দেয়। এই কোষ এবং অণু আমাদের শরীরে প্রবেশ করে এমন কোনও বিদেশী জীব বা পদার্থের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একসাথে কাজ করে । রোগ প্রতিরোধক কোষের অণুগুলি বিশেষত প্যাথোজেনের অণুগুলিকে আবদ্ধ করে এবং সংক্রমণ ছড়াতে বাধা দেয়। কিছু ধরণের রোগ প্রতিরোধক কোষগুলি একটি রোগজীবাণু থেকে দীর্ঘমেয়াদী সুরক্ষাও সরবরাহ করতে পারে ।  উদ্ভিদ এবং প্রাণী, দুয়েরই নির্দিষ্ট সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য কিছু স্তর প্রতিরোধ ক্ষমতা থাকে।

আমাদের কি ভাইরাস থেকে প্রতিরোধ ক্ষমতা রয়েছে?

যখন কোনও ভাইরাস কোনও মানব হোস্টকে সংক্রামিত করে, তখন হোস্টের অনাক্রম্য ব্যবস্থার কোষ এবং প্রোটিনগুলি তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে এবং তাদের শরীরের অন্যান্য কোষগুলিকে আরও সংক্রামিত করা থেকে বিরত করে। হোস্টের অনাক্রম্য কোষ থেকে প্রাপ্ত কিছু প্রোটিন অণু ভাইরাসের কোটের নির্দিষ্ট প্রোটিনের সাথে আবদ্ধ থাকে। তবে ভাইরাসগুলি প্রায়শই আমাদের প্রতিরোধক কোষগুলির ক্রিয়া থেকে বাঁচার উপায়গুলি খুঁজে বের করে।

কেন ভ্যাকসিন প্রয়োজন?

কিছু ক্ষেত্রে ভাইরাসগুলির মতো নির্দিষ্ট রোগজীবাণুগুলির বিরুদ্ধে আমাদের দেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে টিকা দেওয়া হয়। একটি রোগ-সৃষ্টিকারী ভাইরাসকে দুর্বল করা হয় যাতে এটি আর সংক্রমণের কারণ হতে না পারে এবং এই দুর্বল, নিষ্ক্রিয় ভাইরাসটি ভ্যাকসিন হিসাবে পরিচালিত হয়। নিহত ভাইরাসের অংশগুলিও টিকা দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা যেতে পারে। এই ভ্যাকসিনগুলি আমাদের প্রতিরোধক কোষকে ক্রিয়াতে উদ্দীপিত করে এবং ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট ভাইরাস দ্বারা সংক্রমণ থেকে রক্ষা করে। টিকাটি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভাইরাসজনিত রোগের প্রতিরোধ ক্ষমতা নিশ্চিত করে এবং সমস্ত ভাইরাল রোগের জন্য করেনা। এ জাতীয় ভ্যাকসিনগুলির উদাহরণগুলির মধ্যে হাম এবং চিকেনপক্সের ভ্যাকসিন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

 নব্যকরোনাভাইরাসের ( nCOVID19) বিরুদ্ধে মানব দেহ সংক্রমণের প্রতিরোধী নয় এবং আজ পর্যন্ত এমন কোনও ভ্যাকসিন আবিষ্কার করা যায় নি যা সংক্রমণ থেকে আমাদের রক্ষা করতে পারে। সংক্রমণ থেকে দূরে থাকার জন্য সামাজিক দূরত্ব, হাত স্বাস্থ্যবিধি এবং অন্যান্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অনুশীলন করুন।

মশার কামড়ে ছড়ায় না কোভিড১৯ এর সংক্রমণ

কোভিড১৯ ভাইরাস মানুষের ফুসফুস ও শ্বাসনালীকে আক্রমণ করে ও এর ফলে  শ্বাসকষ্টের সমস্যা দেখা দেয়। এদেশে ডেঙ্গি, চিকুনগুনিয়া এমন নানান মশাবাহিত  অসুখের প্রাদুর্ভাব ঘটে প্রতি বছর। । কিন্তু যেসব প্রজাতির মশা মানুষকে কামড়ায়, সেইসব মশারা তাদের শরীরে কোভিড১৯ ভাইরাসকে বহন করতে পারেনা। তাই এই ভাইরাসটি আক্রান্ত মানুষের থেকে সুস্থ মানুষের দেহে মশার কামড়ের দ্বারা সংক্রমিত হয়না।কোভিড ১৯ এর সংক্রমণ মশাবাহিত হতে পারে এই দাবির পিছনে কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।কোভিড১৯ ভাইরাস মূলত ছড়ায় রোগীর হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে। হাঁচি বা কাশির সাথে সাথে মানুষের মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে ছোট ছোট বিন্দু বা বায়ুকণা(droplets)। এই বায়ুকণার উৎপত্তি ফুসফুস  থেকে এবং কোভিড-আক্রান্ত রোগীর বায়ুকণায় থাকে ভাইরাস যা আশেপাশের মানুষকে সংক্রমিত করতে পারে। তাই কোভিড ১৯ ভাইরাসের থেকে বাঁচতে সামাজিক দূরত্ব রাখার নিয়মগুলো মেনে চলা জরুরি। সংক্রমিত রোগীদের এবং যাদের মধ্যে রোগের উপসর্গ দেখা গেছে তাদের থেকে বেশ কিছুটা দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মতে কোভিড ১৯ জনিত রোগের উপসর্গ হল শুকনো কাশি, জ্বর, ক্লান্তি ইত্যাদ।

এন-কোভিড১৯ একটি জৈবিক মারণাস্ত্র নয়। কেন?

এন-কোভিড১৯  সংক্রমণের প্রাদুর্ভাবের শুরুর সাথে সাথেই শুরু হয় নানান ধরণের গুজব রটনা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীন – এই দুই দেশের ষড়যন্ত্র তাত্ত্বিকেরা উঠেপড়ে লাগে নিত্যনতুন গুজব ছড়াতে। মার্কিন ষড়যন্ত্র বাতিকদের মতে  চীনের উহান শহরে এক লেভেল ফোর বায়ো-সেফটি ল্যাবরেটরি থেকে এই ভাইরাসটির উৎপত্তি। এই ধরণের গবেষণাগারগুলিতে  বৈজ্ঞানিকরা ইবোলা ভাইরাসের মতো পৃথিবীর সবচেয়ে মারাত্মক রোগসৃষ্টিকারী জীবাণুদের ওপরে গবেষণা করে থাকেন। এই গবেষণাগারগুলি স্বভাবতই গভীর সুরক্ষায় মোড়া থাকে। তাই উহানে শুধুমাত্র এরকম একটি গবেষণাগারের উপস্থিতি এটি প্রমাণ করে না যে এখানেই জেনেটিক ভাবে পরিবর্তন করে তৈরি করা হয়েছে  এন-কোভিড১৯।

অপরদিকে, চীনের ষড়যন্ত্র বাতিকেরা দায়ী করেছে মার্কিন সেনাবাহিনীকে এই ভাইরাসটির জন্য। কিন্তু বৈজ্ঞানিমতে, এন-কোভিড১৯ মানুষের তুলনায় বাদুড় বা প্যাঙ্গোলিনকে সংক্রমিত করা ভাইরাসগুলোর সাথেই বেশি মেলে। যদি এন-কোভিড১৯ সত্যিই এক জৈবিক মারণাস্ত্র হতো তবে এটিকে মানব সংক্রমণকারী কোনো ভাইরাসের থেকেই তৈরী করা হয়ে থাকতো। এই ভাইরাসটির জেনেটিক তথ্য ব্যবহার করে, গবেষকরা এর বংশলতিকা তৈরী করেছেন। এই বংশবৃত্তান্ত থেকে জানা যায় যে ভাইরাসটি কি করে এক আশ্রয়দাতা থেকে আরেকটিতে ছড়িয়ে পড়ে। তাঁদের মতে, ভাইরাসটি কিছু পশুর থেকে মানুষকে সংক্রামিত করেছে।

কি এই জৈবিক মারণাস্ত্র?

অতীতে, ব্যাকটেরিয়া ও ছত্রাকের মতো ক্ষতিকারক রোগসৃষ্টিকারী জীবাণু  ও তাদের দ্বারা নিঃসৃত কিছু সর্বনাশা অধিবিষকে (টক্সিন)  জৈবিক মারণাস্ত্র রূপে ব্যবহার করা হয়েছে। এই প্যাথোজেনগুলিকে যুদ্ধের সময় পরিকল্পিত ভাবে শত্রূপক্ষের মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। এমন এক জীবাণুর উদাহরণ হল ব্যাসিলাস আন্থ্রাসিস যা আন্থ্রাক্স রোগের জন্য দায়ী এবং  এর আগে জৈবিক মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে ।

জৈবিক মারণাস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত প্রায় সব প্যাথোজেনই প্রাণঘাতী রোগের সৃষ্টি করে। কোভিড১৯ র সংক্রমণের ফলে বহু মানুষ গুরুতরভাবে অসুস্থ হয়ে পড়লেও এ  রোগের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার খুব বেশি নয়, অনেকে সুস্থ ও হয়ে উঠছেন । তাই, এন-কোভিড১৯ একটি জৈবিক মারণাস্ত্র, এই দাবির পেছনে কোনো যুক্তিসঙ্গত প্রমান নেই!

ভাইরাস: কী এই ভাইরাস?

ভাইরাস হলো অতিক্ষুদ্র একপ্রকারের আপাত-জড় পদার্থ। ভাইরাস অন্যান্য জীব যেমন ব্যাক্টেরিয়া, উদ্ভিদ, প্রাণী প্রভৃতিকে সংক্রমিত করতে পারে। এভাবে ভাইরাস বিভিন্ন জীবের মধ্যে বিভিন্ন রোগ সৃষ্টি করে যার ফলে অনেক সম্যে সেই রুগ্ন জীবটির মৃত্যু হয়। ভাইরাসের কোন কোষ থাকে না, ভাইরাসের নিজের সংখ্যাবৃদ্ধি ঘটানোর জন্য অন্য কোষের প্রয়োজন হয়। বেশিরভাগ ভাইরাসেরই এই তিনটি মূল অংশ থাকে- ১) একটি রাসায়নিক সংগঠন যা ভাউরাসটির জিনগত তথ্য বহন করে, ২) একটি বাহ্যিক বর্ম বা রক্ষাকারী আবরণ যা জিনগত তথ্য বহনকারী রাসায়নিক সংগঠনটিকে ঘিরে রাখে, এবং ৩) বাহ্যিক বর্মের ওপর আরও একটি আবরণ। ভাইরাস যদিও জীব নয় কিন্তু যে বিষয়টিতে জীবের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া যায় তা হল উভইয়েই জিনগত তথ্য বহন করে(জীবের ক্ষেত্রে ডি এন এ এবং আর এন এ, ভাইরাসের ক্ষেত্রে আর এন এ) এবং ফলে উভয়েই নিজেদের পুনরুৎপাদনে(জীবের ক্ষেত্রে যেটা প্রজনন) সক্ষম। নিজেদের পুনরুৎপাদনের কৌশল হিসেবে ভাইরাস প্রথমে জীবিত কোষের ভেতরে প্রবেশ করে এবং তারপর সেই কোষের কার্যকরী সংগঠনতন্ত্রকে দখল করে নেয়। এইভাবে নিজেদের সংখ্যা বাড়ানোর পর ভাইরাস কণাগুলি কোষ্টিকে ফাটিয়ে বেরিয়ে পড়ে এবং অপর কোষগুলিকে আক্রমণ করে। অনেকসময়ে এইভাবে ভাইরাস নিজের সংখ্যা বাড়াতে বাড়াতে নিজের জিনগত রাসায়নিক তথ্যের পরিবর্তন ঘটায় এবং তার পরিব্যক্তি বা ‘মিউটেশন’(Mutation) হয়; এইরকম পরিস্থিতিতে সেই ভাইরাসের প্রতিষেধক বা টীকা তৈরী করা কঠিন হয়ে পড়ে। SARS, ইনিফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস, বর্ত্মান সময়ের নভেল কোরোনাভাইরাস প্রভৃতি হল এমন কিছু ভাইরাস যা মানুষকে আক্রান্ত করে। বর্তমান সময়ের নভেল কোরোনাভাইরাস পশুদের দেহে সংক্রমিত হতো এবং মনে করা হচ্ছে চীনের একটি ওয়েট মার্কেট থেকে মানবদেহে সংক্রমিত হয়েছে।